জুয়া খেলার impact on children’s education

বাংলাদেশে জুয়া খেলা শিশুদের শিক্ষার ওপর সরাসরি ও পরোক্ষ দুই ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ইউনিসেফের ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ শিশু কোনো না কোনোভাবে পিতামাতার জুয়া আসক্তির শিকার, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে তাদের স্কুলে উপস্থিতি, একাডেমিক পারফরম্যান্স এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, জুয়া আসক্ত পরিবারের ৬৭% শিশুর স্কুলে উপস্থিতির হার জাতীয় গড়ের চেয়ে ৩০% কম। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই শিশুদের মধ্যে প্রায় ৪০% কোনো না কোনোভাবে নিজেরাও জুয়ার সাথে জড়িত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে, বিশেষ করে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের প্রভাবে।

অর্থনৈতিক দিকটি সবচেয়ে স্পষ্ট। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) তথ্য মতে, জুয়া আসক্ত পরিবারগুলোতে মাসিক আয়ের গড়ে ২২-৩৫% অংশ জুয়ায় ব্যয় হয়। এই অর্থ সরাসরি শিশুর শিক্ষা উপকরণ, প্রাইভেট টিউশন ফি এবং অন্যান্য শিক্ষামূলক চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হওয়ার কথা ছিল। নিচের টেবিলটি দেখায় কিভাবে একটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক বাজেট জুয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়:

ব্যয়ের খাতজুয়া-অনাসক্ত পরিবারে বরাদ্দ (টাকায়)জুয়া-আসক্ত পরিবারে বরাদ্দ (টাকায়)কমবেশির হার
শিশুর শিক্ষা উপকরণ (বই, খাতা, ইউনিফর্ম)১,৫০০৭৫০-৫০%
প্রাইভেট টিউশন/কোচিং৩,০০০১,০০০-৬৬.৭%
স্কুল ফি/ভর্তি ফি১,২০০প্রায়শই বকেয়া-১০০% (বকেয়া অবস্থায়)
জুয়ায় ব্যয়৫,০০০ – ৮,০০০N/A

মানসিক ও সামাজিক প্রভাব আরও গভীর। শিশুরা যখন বাড়িতে পিতামাতার মধ্যে জুয়া নিয়ে ঝগড়া, আর্থিক সংকট এবং মানসিক অশান্তি প্রত্যক্ষ করে, তা তাদের মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণা নির্দেশ করে যে, এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার লক্ষ্মণ দেখা দেওয়ার হার সাধারণ শিশুদের তুলনায় ৩ গুণ বেশি। এই মানসিক চাপ সরাসরি তাদের ক্লাসরুমে মনোযোগ দেয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং একাডেমিক ফলাফলকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।

সময়ের অপচয়ও একটি বড় ইস্যু। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব আইসিটি ইন ডেভেলপমেন্ট (BIID) এর পর্যবেক্ষণ হলো, যে সব কিশোর-কিশোরী অনলাইন জুয়া বা বাংলাদেশ জুয়া সংক্রান্ত কন্টেন্টের সাথে জড়িত হয়, তাদের পড়াশোনায় ব্যয় করা সময় দৈনিক গড়ে ২-৩ ঘন্টা কমে যায়। তারা ভিডিও গেমের ছদ্মবেশে আসলে জুয়ার মেকানিজম শেখে এমন গেমে সময় কাটায়, যা তাদের শিক্ষার ভিতকে দুর্বল করে দেয়। বাংলাদেশ জুয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর দিকে তরুণদের আকর্ষণ করার কৌশল এখন আরও সূক্ষ্ম ও প্রযুক্তিনির্ভর।

শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। যখন তারা দেখে যে বড়রা সহজ লাভের আশায় জুয়া খেলছে, তখন তাদের মধ্যেও এই মনোভাব গড়ে উঠতে পারে যে পরিশ্রম না করেও সাফল্য পাওয়া সম্ভব। এটি তাদের মধ্যে অধ্যবসায় ও কঠোর পরিশ্রমের মূল্যবোধকে নষ্ট করে দেয়, যা শিক্ষা অর্জনের মূল ভিত্তি। ঢাকার বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষকদের সাথে আলাপচারিতায় উঠে এসেছে যে, জুয়া আসক্ত পরিবার থেকে আসা অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় নকল করার প্রবণতা বেশি দেখায়, কারণ তারা ঝুঁকি নিয়ে দ্রুত সাফল্য পেতে চায়—একটি আচরণ যা তারা জুয়ার সংস্কৃতি থেকে শিখেছে।

শারীরিক পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। জুয়া খেলা হয় এমন বাড়িগুলোতে প্রায়শই শব্দদূষণ, অস্থিরতা এবং পড়াশোনার জন্য উপযুক্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশের অভাব থাকে। একটি শিশুর বাড়িতে পড়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট জায়গা বা ডেস্ক থাকা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু জুয়া আসক্ত পরিবারে এই বিষয়টির প্রতি খুব কমই নজর দেওয়া হয়। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির তথ্য অনুসারে, এই ধরনের পরিবারের ৭০% শিশুর পড়ার জন্য আলাদা ঘর বা কোণ নেই, যা তাদের একাগ্রতাকে ব্যাহত করে।

অনলাইন জুয়ার প্রসার এই সমস্যাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। গ্রামাঞ্চলে স্মার্টফোনের ব্যাপক প্রসারের সাথে সাথে কিশোর-কিশোরীরা খুব সহজেই জুয়ার অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে পারছে। বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটory কমিশন (BTRC) এর তথ্য মতে, ২০২৪ সালে শনাক্ত করা হয়েছে এমন ৫০টিরও বেশি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম যা স্থানীয় তরুণদের টার্গেট করে জুয়ার সেবা দিচ্ছে। এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে রং-বেরঙের গ্রাফিক্স এবং ভুয়া বিজয়ের গল্প শেয়ার করে তরুণদের আকৃষ্ট করা হয়।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক স্কুলে প্যারেন্ট-টিচার মিটিংয়ে এই বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করার কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে, রাজশাহী ও খুলনা অঞ্চলের কিছু স্কুল সফলতার সাথে ‘জুয়ার বিরুদ্ধে সচেতনতা’ কর্মশালার আয়োজন করেছে, যার ফলশ্রুতিতে ওইসব স্কুলের শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার ১৫% কমেছে। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। শিশুদের শিক্ষার ভবিষ্যৎ রক্ষায় জুয়ার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা এবং আইনের প্রয়োগ জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top
Scroll to Top